বাক্য প্রকরণ | বাংলা ব্যাকরণ

যে সব পদ মিলে বক্তার সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ পায় , তাকে বাক্য বলে । এক কথায় বলা যায় , অর্থপূর্ণ পদসমষ্টিই হল বাক্য।

বাক্য প্রকরণ

যে সব পদ মিলে বক্তার সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ পায় , তাকে বাক্য বলে । এক কথায় বলা যায় , অর্থপূর্ণ পদসমষ্টিই হল বাক্য ।

ভাষার মূল উপকরণ বাক্য এবং বাক্যের মূল উপাদান শব্দ । কতকগুলো পদের সমষ্টিতে বাক্য গঠিত হলেও , যে কোন পদসমষ্টিই বাক্য নয় । বাক্যে বিভিন্ন পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধ থাকা অত্যাবশ্যক । ভাষার বিচারে বাক্যের তিনটি গুণ থাকা চাই । যথা- ( ১ ) আকাঙ্ক্ষা , ( ২ ) আসত্তি ও ( ৩ ) যোগ্যতা ।

বাক্য প্রকরণ | বাংলা ব্যাকরণ |sentence-variation

আকাঙ্ক্ষা: বাক্যের অর্থ পরিষ্কারভাবে বুঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শুনার যে ইচ্ছা , তাই আকাঙ্ক্ষা । যেমন- “ সূর্য পশ্চিমে অস্ত " - বললে বাক্যটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে না , আরো কিছু শুনার ইচ্ছা হয় । এ ইচ্ছাটি পূরণ হয় , যদি বলা যায় - সূর্য পশ্চিমে অস্ত যায় । এখানে আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয়েছে বলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য ।

আসত্তি: বাক্যের অর্থ অনুসারে পদস্থাপনের নামই আসত্তি । মনোভাব প্রকাশের জন্য পদগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে মনোভাব প্রকাশে অসুবিধে না হয় । যেমন “ বন্ধ স্কুল শুক্রবারে থাকে । " পদগুলো এভাবে সাজালে ভাবটি যথাযথ প্রকাশ পায় না । তাই এটি বাক্য নয় — এ বাক্যে আসত্তি ( পদের নৈকট্য ) রক্ষিত হয়নি । পুরোপুরি মনোভাব প্রকাশের জন্য পদগুলো সাজাতে হবে যেমন- শুক্রবারে স্কুল বন্ধ থাকে।

যোগ্যতা: বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলোর অর্থগত ও ভাবগত মিল থাকার নাম যোগ্যতা । যদি বলা যায় , সূর্য উঠলে অন্ধকার হয় । মাঠে মাঠে মানুষ চরে, তা হলে কথাগুলো ঠাট্টা - তামাসার মত শুনাবে । কেননা , সূর্য উঠলে কখনও অন্ধকার হয় না বা মাঠে মাঠে মানুষ চরে না । সুতরাং বাক্যের মধ্যে অর্থের অসঙ্গতি ঘটছে । বাক্যগুলো যোগ্যতা সম্পন্ন হবে , যদি বলা যায় সূর্য উঠলে আলোকিত হয় । মাঠে মাঠে গবাদিপশু চরে।

উদ্দেশ্য ও বিধেয়

প্রত্যেক বাক্যের দু'টি অংশ থাকে । যথা- উদ্দেশ্য ও বিধেয় ।

যাকে উদ্দেশ্য করে কোন কিছু বলা হয় , তাকে উদ্দেশ্য বলে এবং উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যা কিছু বলা হয় , তাকে বিধেয় বলে । যেমন — বালকটি বই পড়ে । এ বাক্যে “ বালকটি ” উদ্দেশ্য এবং “ বই পড়ে " বিধেয় ।

উদ্দেশ্য ও বিধেয় একটি মাত্র পদ হতে পারে , আবার অনেকগুলো পদের সমষ্টিও হতে পারে । বাক্য কত বড় হবে , তার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই । উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে সম্প্রসারিত করে অনেক ক্ষেত্রে বাক্য দীর্ঘ করা যেতে পারে ।

উদ্দেশ্যকে নিম্নলিখিতভাবে বর্ধিত করা যায় ।

  • বিশেষণ যোগে: কুখ্যাত ডাকাতদল ধরা পড়েছে ।
  • সম্বন্ধ পদ যোগে: আলিমের ভাই আজ বাড়ী এসেছে।
  • সমার্থক বাক্যাংশ যোগে: যারা অত্যন্ত পরিশ্রমী তারাই জীবনে উন্নতি করে ।
  • অসমাপিকা ক্রিয়াবিশেষণ যোগে: এ কথা বলতে বলতে কণা কেঁদে ফেলল ।
বিধেয়কে নিম্নলিখিতভাবে বর্ধিত করা যায়।
  • ক্রিয়া - বিশেষণ যোগে: বায়ু ধীরে ধীরে বইছে।
  • ক্রিয়া বিশেষণীয় বাক্যাংশ যোগে - রকেট অতিশয় দ্রুত চলে।
  • কারক যোগে: বৃক্ষ হতে শুষ্ক পত্র ঝরে পড়ছে।
  •  বিশেষণের বিশেষণ যোগে: এ লোক অত্যন্ত গরীব ।

গঠন অনুসারে বাক্যের প্রকারভেদ বাক্যের বিশ্লেষণ

গঠন অনুসারে বাক্যকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় । যথা- ( ১ ) সরল বাক্য , ( ২ ) জটিল বা মিশ্র বাক্য ও ( ৩ ) যৌগিক বাক্য ।

সরল বাক্য ( Simple Sentence )

যে বাক্যে একটি মাত্র কর্তা ও একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে , তাকে সরল বাক্য বলে । যেমন- পাখি উড়ে । কোকিল ডাকে । রহিম স্কুলে গিয়েছে । এখানে উল্লিখিত ৩ টি বাক্যে যথাক্রমে ‘ পাখি ’ , ‘ কোকিল ও ‘ রহিম ’ প্রত্যেকে এক একটি কর্তা এবং ‘ উড়ে ’ , ‘ ডাকে ’ ও ‘ স্কুলে গিয়েছে ' এক একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকার দরুণ প্রতিটি বাক্য সরল বাক্য ।

সরল বাক্যে একাধিক উদ্দেশ্য পদ থাকলে সেগুলোকে সম্মিলিতভাবে একটি মাত্র উদ্দেশ্য বলে ধরা হয় । বিশেষণ পদ ও সম্বন্ধ পদ দ্বারা ' উদ্দেশ্য ' সম্প্রসারিত করা যায় । যেমন- রফিকের ছেলে রাশেদ স্কুলে যায় । এখানে ' রফিকের ছেলে ’ উদ্দেশ্য পদের সম্প্রসারক । সরল বাক্যে ক্রিয়া - বিশেষণ ও বিভিন্ন কারকযোগে বিধেয় সম্প্রসারিত হয়ে থাকে । যেমন- কণা বেড়াতে যায় । এখানে ' কণা ' উদ্দেশ্য , ‘ যায় ’ বিধেয় এবং ‘ বেড়াতে ’ বিধেয়ের সম্প্রসারক ।

জটিল বা মিশ্র বাক্য ( Complex Sentence )

যে বাক্যে একটি মাত্র প্রধান এবং তার উপর নির্ভরশীল এক বা একাধিক অপ্রধান বাক্য থাকে , তাকে জটিল বাক্য বলে । জটিল বাক্যের অপর নাম মিশ্র বাক্য । যেমন- যে মিথ্যা কথা বলে , তাকে কেউ বিশ্বাস করে না । এই বাক্যে তাকে কেউ বিশ্বাস করে না - এটি প্রধান বাক্য যে মিথ্যা কথা বলে এটি অপ্রধান বাক্য ।

খণ্ড বাক্যাংশ: যে সব বাক্যাংশ দ্বারা ( প্রধান ও অপ্রধান ) জটিল বা যৌগিক বাক্য গড়ে উঠে , সেগুলোকে উপাদান বা খণ্ড বাক্যাংশ বলে ।

( ক ) প্রধান বাক্যাংশ : মূল বাক্যের মধ্যে যে বাক্যাংশটি স্বয়ম্ভর অর্থাৎ কারো উপর নির্ভরশীল নয় , তাকে প্রধান বা নিরপেক্ষ বাক্যাংশ বলে । আলোচ্য বাক্যে তাকে কেউ বিশ্বাস করে না ' বাক্যাংশটি নিরপেক্ষ বলে তা প্রধান বাক্যাংশ ( Principal Clause ) ।

( খ ) অপ্রধান বাক্যাংশ: যে রাক্যাংশটি মূল বা প্রধান বাক্যের উপর নির্ভরশীল তাকে অপ্রধান বা সাপেক্ষ বাক্যাংশ বলা হয় । আলোচ্য বাক্যে যে মিথ্যা কথা বলে বাক্যাংশটি প্রধান বাক্যাংশের উপর নির্ভরশীল । সুতরাং এটি অপ্রধান বা সাপেক্ষ বাক্যাংশ Subordinate Clause ) ।

এই অপ্রধান বাক্যাংশ অনেক ক্ষেত্রে প্রধান বাক্যাংশের বিশেষ্য , বিশেষণ বা ক্রিয়া বিশেষণরূপে কাজ করে ।

  • বিশেষ্যবাচক অপ্রধান বাক্যাংশ ( Noun Clause ) : অপ্রধান বাক্যাংশ যখন প্রধান বাক্যাংশের কোন পদের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্বন্ধযুক্ত হয় তখন তাকে বিশেষ্যবাচক বাক্যাংশ ' বলে । যেমন- রতন বলল , “ তুই সুযোগ পেয়েছিস " । এখানে অপ্রধান বাক্যাংশটি প্রধান বাক্যাংশের ' বলল ' ক্রিয়ার কর্মরূপে একটি বিশেষ্যবাচক বাক্যাংশ ।
  • বিশেষণবাচক অপ্রধান বাক্যাংশ ( Adjective Clause ) : অপ্রধান বাক্যাংশ যখন প্রধান বাক্যাংশের কোন পদের সঙ্গে বিশেষণরূপে সম্বন্ধযুক্ত হয় , তখন তাকে বিশেষণবাচক অপ্রধান বাক্যাংশ বলে । যেমন- যে পরিশ্রমী হয় , সে উন্নতি করে । এখানে যে পরিশ্রমী হয় । এই অপ্রধান বাক্যাংশটি প্রধান বাক্যাংশ ' সে ' পদের বিশেষণ বাক্যাংশরূপে ব্যবহৃত হয়েছে ।
  • ক্রিয়া - বিশেষণবাচক বাক্যাংশ ( Adverbial Clause ) : যে অপ্রধান বাক্যাংশ প্রধান বাক্যাংশের কোন সমাপিকা বা অসমাপিকা ক্রিয়ার সঙ্গে ক্রিয়ার বিশেষণরূপে সম্বন্ধযুক্ত হয় , তাকে ক্রিয়া - বিশেষণবাচক বাক্যাংশ বলে । যেমন- যদি শহরে যাই , সংবাদ আনব । এখানে প্রধান বাক্যাংশের ' আনব ' সমাপিকা ক্রিয়ার বিশেষণরূপে ' যদি শহরে যাই ' বাক্যাংশটি ব্যবহৃত হয়েছে । সুতরাং এটি ক্রিয়া বিশেষণবাচক বাক্যাংশ ।

যৌগিক বাক্য ( Compound Sentence )

দুই বা তার অধিক বাক্য যখন কোন অব্যয়যোগে যুক্ত হয় , তখন তাকে যৌগিক বাক্য বলে । যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত প্রত্যেক বাক্যই স্বাধীন । এই স্বাধীন বাক্যগুলো ও , এবং , অথবা , নতুবা , কিংবা , বটে , কিন্তু ইত্যাদি অব্যয় পদ দ্বারা যুক্ত থাকে । যেমন- রহিম বুদ্ধিমান , কিন্তু পড়াশুনায় সে অমনোযোগী । এখানে ' রহিম বুদ্ধিমান ' , ' পড়াশুনায় সে অমনোযোগী ’ -এই দুইটি স্বাধীন বাক্য ' কিন্তু ' অব্যয় দ্বারা একটি যৌগিক বাক্যে পরিণত হয়েছে ।

আলোচ্য বাক্যে দু'টি খণ্ড বা উপাদান বাক্যাংশ আছে । তেমনি , রাম বনে যাবেন ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিবেন , ( দু'টি সরল বাক্য মিলে যৌগিক ) । সে কারো দাসত্ব করতে চায় না , এদিকে টাকার অভাব হলে যার তার কাছে হাত পাতে ( সরল ও মিশ্র বাক্য মিলে যৌগিক বাক্য ) ইত্যাদি ।

যৌগিক বা সংযুক্ত বাক্যে অনেক সময় অব্যয় দ্বারাই অর্থ গ্রহণ হয় বলে উদ্দেশ্য , বিধেয় বা এদের প্রসারকের পুনরুক্তির আবশ্যক হয় না , কিন্তু বাক্যটি বিশ্লেষণ করতে গেলে এর পুনরুক্তির আবশ্যক হয় । যেমন- সে বিদ্বান বটে , কিন্তু তার ভাই মোটেই তা নয় । যেমন কর্ম তেমন ফল , একথা তোমাকে বার বার বলেছি , কিন্তু তুমি ভ্রূক্ষেপ করনি । –এটি মিশ্র বাক্যযুক্ত যৌগিক বাক্য , ' কিন্তু অব্যয় দ্বারা গঠিত হয়েছে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন