বর্ষাকাল রচনা | বাংলার বর্ষা | বর্ষায় বাংলাদেশ

বর্ষার প্রাকৃতিক আবহ - ই এমন যে মন যেন কেমন - কেমন করে ওঠে । বর্ষা বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঋতু । আষাঢ় ও শ্রাবণ এ দুই মাস বর্ষাকাল ।

বর্ষাকাল

এছাড়াও আরো যে বিষয় সম্পর্কে লিখতে পারবে:
👉বাংলার বর্ষা
👉বর্ষায় বাংলাদেশ
👉বাংলাদেশের বর্ষা

ভূমিকা :

বর্ষার প্রাকৃতিক আবহ - ই এমন যে মন যেন কেমন - কেমন করে ওঠে । এমন দিনে হৃদয় যেন কার সান্নিধ্য লাভ করতে চায় । মেঘের গম্ভীরনাদ , আকাশে বিদ্যুতের ঝলক আর অঝাের ধারা - বর্ষণ বর্ষা ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে গরবিনী বর্ষা আগমন করে তার সজল রূপ ও সৌন্দর্য নিয়ে । বর্ষা বিরহীকে বিরহ - কাতর করে তােলে , প্রেমি - মনকে প্রেম - ঘনিষ্ঠ করে দেয় আর সাধারণ মানুষকে অবলােকন করায় অফুরন্ত সৌন্দর্য । কৃষি - নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে , বর্ষার অনুপস্থিতি কল্পনাই করা যায় না । আমাদের চরমভাবাপন্ন জলবায়ুতে বর্ষা অবস্থান করছে স্বীয় বৈশিষ্ট্যে ও বৈচিত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে । কবিগুরু লিখেছিলেন-
“ এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘাের বরিষায় । ”

বর্ষার আগমন :

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের প্রশান্তি নিয়ে আসে বর্ষা । আষাঢ় ও শ্রাবণ — এই দুই মাস বর্ষাকাল হলেও এর আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় বর্ষার আগমন বার্তা । আবার শ্রাবণের শেষেও বার্তা যেন বিদায় নিতে চায় না । আরও কিছুদিন বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে চলে । বর্ষার আগমনে শুষ্ক - রুক্ষ প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায় , গাছ - পালা বৃক্ষরাজি সজীব হয়ে ওঠে , মন - ময়ূরী নতুন সাজে সেজে ওঠে , নেচে ওঠে । কবির ভাষায় বর্ষার আগমনী-
“ আমি বর্ষা , আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি ,
মায়ার কাজল চোখে , মমতায় বর্মপুট ভরি । ”

বর্ষার রূপ :

ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলাদেশে বর্ষার রূপ ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন । বর্ষা ঋতু তার নিজের বৈশিষ্ট্যের কারণেই অন্য সব ঋতুর চাইতে পৃথক ও দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে পেরেছে । বর্ষায় বাংলার নদী - নালা , খাল - বিল পানিতে ভরে ওঠে । অনেক নিম্নাঞ্চলও পানিতে ভরে যায় । তখন নৌকাই হয় একমাত্র বাহন । বর্ষায় আকাশ থাকে কালাে মেঘে আচ্ছন্ন । বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ চারদিক আঁধার হয়ে শুরু হয় বৃষ্টিপাত । মাঝে মাঝে কয়েকদিন পর্যন্ত সূর্যের দেখা পাওয়া যায় না । খরতপ্ত পৃথিবীকে দু - দণ্ডের প্রশান্তি দেয় বর্ষা । মাটির কোমল স্পর্শে শস্য - চারা তুর হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে । পত্রপল্লবে নব পুষ্পের সাজ , বৃক্ষের শাখায় শাখায় নব পত্রের অঙ্কুরােদ্গম , আর প্রকৃতিতে সজল সজীবতা বর্ষার প্রাণচাঞ্চল্য প্রকাশ করে । বর্ষার অবিরাম বৃষ্টির কারণে শহরের জীবনে কর্মজীবনে বাধার সৃষ্টি হলেও গ্রামের চাষিদেরকে এ সময় মাঠে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় । বর্ষা কখনাে কখনাে এনে দেয় অফুরন্ত অবসর । এমন দিনে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করে কবি গেয়েছেন-

“ নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিল ঠাই আর নাহি রে
ওগো , আজ তােরা যাসনে ঘরের বাহিরে । ”

বর্ষায় প্রাকৃতিক দৃশ্য :

বর্ষা বাংলার প্রকৃতিকে দান করে নতুন রূপ । শুষ্কপত্র আর পত্রশূন্য বৃক্ষরাজি ভরে ওঠে সবুজের সমারােহে । গাছে গাছে ফোটে কদম , কেয়া , জুই ইত্যাদি বর্ষার ফুল । মরুময় প্রান্তিরসমূহ শ্যামল তৃণে - শস্যে ও ফলমূলে ভরে ওঠে । ছােট ছােট ডিঙি নৌকাগুলাে ভেসে চলে ভরা নদীর উপর দিয়ে । ধানের চারাগুলাে জলের পরশে শ্যামল হয়ে মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হতে থাকে । ময়ূর পেখম মেলে নাচে , মন - ময়ূরীও নেচে ওঠে বর্ষার সজল সজীব প্রকৃতির সৌম্য রূপ অবলােকন করে । কবির ভাষায়-

‘ময়ূর পেখম মেলে
সুখে তান ধরছে
বর্ষার ঝর ঝর
সারাদিন ঝরছে । ”

মানব মনে বর্ষার প্রভাব :

বসন্ত যদি হয় ‘ ঝতুরাজ ’ , তবে বর্ষা হল ঋতুর রানি । বর্ষার সজল প্রাণবন্ত রূপ মানুষের মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে । বিরহী মনকে বর্ষা আরও বিরহ - কাতর করে তােলে - প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের আশায় মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে । বর্ষা মানুষকে প্রায়শই কর্মবিচ্ছিন্ন করে ভাব - জগতের গভীরে কল্পনা - বিলাসী হয়ে উঠতে প্রেরণা যােগায় । বর্ষা আমাদের কবি - মনেও ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়ে চলেছে — বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিতার অনেকগুলােই বর্ষাকে ভিত্তি করে রচিত । বর্ষার বিরামহীন বারিধারা কিংবা স্নিগ্ধ - সৌম্য প্রকৃতি মানুষের হৃদয় বাতায়নে কড়া নাড়ে । বিদ্যাপতি থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকল কবিই বর্ষা - বন্দনায় মুখরিত হয়েছেন । বর্ষার রূপশ্রীতে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্র - হৃদয় নেচে উঠেছে ময়ূরের মতাে-

“ হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে
ময়ূরের মতাে নাচে রে । ”

বাংলার অর্থনৈতিক জীবনে বর্ষা :

কৃষক আর কৃষির দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ । আমাদের কৃষি সফলতার অনেকখানিই নির্ভর করে বর্ষার উপর । কৃষক এই ঋতুতে বীজ বােনে , চারা তােলে , চারা রােপণ করে । বৃষ্টিহীনতায় দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শস্য উৎপাদন । কেননা এখনও পর্যন্ত সেচসুবিধা দেশের সব জায়গায় গিয়ে পৌছায় নি , অনেকের সামর্থ্যও নেই সেচের মাধ্যমে জমিতে পানি দেওয়ার ।

বর্ষার উপকারিতা :

বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে দেশের ময়লা আবর্জনা ধুয়ে - মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় , দূষিত বায়ু বিশুদ্ধ হয় । বর্ষা বাংলার প্রকৃতিকে সুজলা - সুফলা শস্য - শ্যামলা করে । বর্ষার বারিপতনের উপরই নির্ভর করে বাঙালির আশা - আকাঙক্ষা , সজীবতা ও সরসতা । বর্ষার জলধারা জমিতে পলি টেনে এনে ভূমিকে উর্বর করে । প্রকৃতিতে এ সময় দেখা যায় রকমারি ফলের আয়ােজন , বিচিত্র ফসলের সম্ভার । নদীপথের যাতায়াত এবং পরিবহন হয় সহজ , সরল ও প্রশস্ত । এক সময় তাই গ্রামীণ বাণিজ্য ও অর্থনীতি পুরােপুরি বর্ষানির্ভর ছিল ।

বর্ষার অপকারিতা :

বর্ষার কিছু অপকারী দিকও রয়েছে । বর্ষার পানিতে রাস্তাঘাট জল - কাদায় ভরে ওঠে , শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা । চলাচলে যেমন অসুবিধার সৃষ্টি হয় , তেমনি নষ্ট হয় অসংখ্য কর্মঘণ্টা । যারা দিন এনে দিন খায় তাদের জন্য বর্ষা কখনাে কখনাে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় । দরিদ্র জনগােষ্ঠীর ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে , অনেক সময় ঝড়ে ঘরের চাল উড়ে যায় । কখনােবা অতিবর্ষণে সৃষ্টি হয় বন্যা । খাদ্যাভাবে পড়তে হয় মানুষকে । বর্ষার দূষিত পানিতে টাইফয়েড , কলেরা , আমাশয়সহ বিভিন্ন রােগ মহামারি আকারে দেখা দেয় ।

উপসংহার :

প্রকৃতি ও মানবজীবনে বর্ষার প্রভাব অপরিসীম । বর্ষার কিছু অপকারী দিক থাকলেও বর্ষার ইতিবাচক ভূমিকা অনেক বেশি । বর্ষা আমাদের জন্য অভিশাপ নয় , আশীর্বাদ । বর্ষা ছাড়া রিক্ত - শুষ্ক হতাে পৃথিবী , মরুময় হয়ে থাকত ভূভাগ আর বর্ষার স্পর্শে সজীব হয়ে ওঠে প্রকৃতি । অপূর্ব রূপশ্রীতে চারপাশকে সাজিয়ে তােলে বর্ষা । আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন বিমুগ্ধচিত্তে-

“ বরষা ওই এল বরষা
অঝাের ধারায় জল ঝরঝরি অবিরল
ধূসর নীরস ধরা হল সরসা ।

আরও পড়ুন:

১টি মন্তব্য

  1. অনেক সুন্দর অনেক সুন্দর